আমার চার বছরের ছেলে জানে না ফলমূল বা সবজি দেখতে বা খেতে কেমন
বিস্তারিত দেখুন নিচের ভিডিও লিংকে এস,এম, আব্দুল্লাহ্ প্রতিবেদনে…
গাজার দুর্ভিক্ষে বাসিন্দারা ভয়াবহ ক্ষুধার সম্মুখীন। রীম তৌফিক খাদার তাদের মধ্যে অন্যতম। পাঁচ সন্তান নিয়ে উপত্যকাটিতে বসবাস করছেন তিনি। করুণ দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ মাসে আমরা কোনো আমিষ খাইনি। আমার চার বছরের ছেলে জানে না ফলমূল বা সবজি দেখতে বা খেতে কেমন।’ গাজার দুর্ভিক্ষে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘দুর্ভিক্ষের ঘোষণা অনেক দেরিতে আসলেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’ জাতিসংঘ-সমর্থিত প্রতিবেদন বলছে, গাজার সহায়তা প্রবেশে ব্যাপকভাবে বাধা দিচ্ছে ইসরায়েল। তবে তেল আবিব এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গাজাজুড়ে ক্ষুধা ও অনাহারের পরিস্থিতি অভিজ্ঞ প্রত্যক্ষদর্শী, মানবিক সংস্থা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে শুক্রবার জাতিসংঘ-সমর্থিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন বা আইপিসি প্রথমবারের মতো বলেছে, গাজা সিটি ও আশপাশের এলাকায় “সম্পূর্ণভাবে মানবসৃষ্ট” দুর্ভিক্ষ চলছে। উপত্যকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ২৭১ জন দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টিতে মারা গেছে, যার মধ্যে ১১২ জনই শিশু। ছয় সন্তানের মা রাজা তালবেহ বলেন, তিনি এক মাসে ২৫ কেজি ওজন হারিয়েছেন এবং গ্লুটেন বা শস্য জাতীয় খাবার সহ্য করতে না পারার কারণে খাবার খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে তার জন্য। তিনি জানান, বোমাবর্ষণ, বাস্তুচ্যুত জীবন, শীত-গরমের প্রভাব, এবং দুর্ভিক্ষ—এই সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ। রিদা হিজেহ জানান, তার পাঁচ বছরের মেয়ে লামিয়ার ওজন ১৯ কেজি থেকে নেমে সাড়ে ১০ কেজি হয়েছে। অপুষ্টির কারণে তার পা ফুলে গেছে, চুল পড়ছে এবং স্নায়ু সমস্যায় ভুগছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘সে হাঁটতে পারছে না। বহু ডাক্তার দেখিয়েছি, সবাই অপুষ্টি বলেছে, কিন্তু কেউ সহায়তা দেয়নি।’ ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা ‘ইউকে-মেড’ এর নার্স ম্যান্ডি ব্ল্যাকম্যান জানিয়েছেন, মাতৃত্বকালীন, প্রসবের আগে ও পরে নারীদের ৭০ শতাংশের শরীরে অপুষ্টি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর ফলে ছোট ও নাজুক অবস্থায় জন্ম নিচ্ছে নবজাতকরা। আসিল নামের এক বাসিন্দা বলেন, পাঁচ মাস আগে তার ওজন ৫৬ কেজি ছিল, এখন মাত্র ৪৬ কেজি। তিনি মাসের পর মাস কোনো ফল বা আমিষ খেতে পারেননি। তার ননদ মরিয়া হয়ে শিশুদের জন্য সাশ্রয়ী দামে গুঁড়া দুধ খুঁজছেন। আসিল যোগ করেন, ‘দাম এত বেশি যে কিনে খাওয়া প্রায় অসম্ভব। যদি এটি পাওয়াও যায়, এর প্রতি ক্যানের দাম পড়ে ১৮০ শেকেল বা ৩৯ ইউরো। হাজারো মানুষের মতো আমরাও দিন গুণে বেঁচে আছি।’ সেভ দ্য চিলড্রেনের কর্মকর্তা শাইমা আল-ওবাইদি বলেন, গাজার দুর্ভিক্ষকে দেখে কোনো চমকপ্রদ তথ্য আশা করা যায় না। মার্চ মাসের রমজান থেকেই গাজায় সাহায্য স্থগিত হয়ে যায়। তাজা ফল, শাকসবজি কিংবা ময়দার কোনো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছিল না এবং কিছু থাকলেও বাজারে স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল। তিনি আরও বলেন, মানুষ ঘাস ও পাতা খাচ্ছিল। শিশুরা এমন দুঃখজনক অবস্থার কারণে বলছিল, তারা যেন মারা যায়, যেন জান্নাতে গিয়ে তারা খাবার খেতে পারে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে, যা এখন পর্যন্ত ৬২ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধার কারণে গাজা এখন মানবিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
